মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চীনের কাছ থেকে শত কোটি ডলারের পণ্য কিনছে ইরান। এ জন্য দেশটি অনেকটা পণ্যবিনিময় ব্যবস্থার মতো একটি গোপন আর্থিক কাঠামো ব্যবহার করছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা ইরানের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাসহ মোট পাঁচজন সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানি তেল চীনে বিক্রির পর এর অর্থ সরাসরি ডলার বা নগদ হিসেবে ইরানে ফেরত নেওয়া হয় না। বরং চীনে বিশেষ একটি হিসাব বা ক্রেডিট ব্যবস্থায় ইরানের নামে অর্থ জমা থাকে। পরে সেই ক্রেডিট ব্যবহার করে চীনা পণ্য কেনা হয়।
সহজভাবে বলতে গেলে, এটি অনেকটা শপিং মলের উপহার কার্ডের মতো। ইরান তেল সরবরাহ করে চীনে একটি ‘ক্রেডিট’ জমা করছে। পরে সেই ক্রেডিট ব্যবহার করে চীনের কাছ থেকেই প্রয়োজনীয় পণ্য কিনছে। ফলে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ডলার লেনদেনের প্রয়োজন কমে যাচ্ছে।
এসপিভির মাধ্যমে বাণিজ্য
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এই ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বিশেষ উদ্দেশ্যে গঠিত প্রতিষ্ঠান বা স্পেশাল পারপাস ভেহিকল (এসপিভি)। ইরানের তেল বিক্রির অর্থের একটি অংশ এই ধরনের ব্যবস্থায় রাখা হয় এবং পরে ইরানে পণ্য সরবরাহকারী চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থ পরিশোধে তা ব্যবহার করা হয়।
সূত্রগুলোর দাবি, গত এক বছরে এসপিভি ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরান ও চীনের মধ্যে প্রায় ২০০ কোটি থেকে ২৫০ কোটি ডলারের লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ অর্থ অবকাঠামো প্রকল্পে বরাদ্দ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। বাকি অর্থ বিশেষ ব্যবস্থায় রেখে ইরানে পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থ পরিশোধে ব্যবহার করা হয়।
ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দুটি সূত্র এসপিভির অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছে। পাঁচটি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এ অর্থ ব্যবস্থাপনায় চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হয়ে কাজ করা একটি প্রতিষ্ঠান এবং ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান ভূমিকা রাখে।
ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো আমদানিকারককে এসপিভির অর্থ ব্যবহারের অনুমোদন দিলে সংশ্লিষ্ট ইরানি প্রতিষ্ঠান চীনা পক্ষকে বিষয়টি জানায়। এরপর ইরানে পণ্য সরবরাহকারী চীনা প্রতিষ্ঠানকে অর্থ পরিশোধ করা হয়।
তবে রয়টার্স চীনের কোম্পানি নিবন্ধনসংক্রান্ত নথিতে ‘চুইশিন’ নামে কথিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হয়ে কাজ করে বলে যে প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা বলা হয়েছে, সেগুলোরও কোনো প্রকাশ্য রেকর্ড পাওয়া যায়নি। একটি সূত্রের ধারণা, ‘চুইশিন’ হয়তো শুধু একটি স্প্রেডশিটে ব্যবহৃত নাম।
২০২১ সাল থেকে ব্যবস্থাটি চালু
রয়টার্সের তিনটি সূত্র জানিয়েছে, অন্তত ২০২১ সাল থেকে এই ব্যবস্থা চালু রয়েছে। শুরুর দিকে এর মাধ্যমে ইরানে ওষুধ এবং কোভিড-১৯-এর টিকা সরবরাহ করা হতো। পরে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বাড়তে থাকায় এই ব্যবস্থা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সূত্রগুলোর দাবি, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরান চীন থেকে ওষুধ, যানবাহন ও যোগাযোগ সরঞ্জাম কিনেছে। এসব পণ্যের নির্মাতারা সরাসরি ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করেনি বলে তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া গত এক বছরে অন্তত একবার কয়েক কোটি ডলারের আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ইরানে সরবরাহের চুক্তিতেও একই ধরনের ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সূত্রগুলো। তবে এসব লেনদেন সত্যিই সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।
চীনের বড় তেল ক্রেতা হিসেবে ভূমিকা
দশকের পর দশক ধরে চলা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানি তেলের ক্রেতা সীমিত। পণ্যবাজারবিষয়ক তথ্য ও বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরান থেকে সমুদ্রপথে পাঠানো তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনেছে চীন। দেশটি প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল ইরানি তেল কিনেছে।
২০২১ সালে ইরান ও চীন ২৫ বছরের একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি সই করে। এতে জ্বালানি, অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে চুক্তিটির বিস্তারিত প্রকাশ্যে খুব বেশি আসেনি।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঝুহাই ঝেনরংয়ের হয়ে কাজ করা একটি ক্রেতা চলতি বছর পর্যন্ত চীনের একটি অজ্ঞাত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হিসাবে মাসে শত শত কোটি ডলার জমা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন একজন পশ্চিমা কর্মকর্তা ও এ ব্যবস্থা সম্পর্কে অবগত দুই ব্যক্তি।
তাদের দাবি, ইরানের জাতীয় তেল কোম্পানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হংকংয়ে নিবন্ধিত একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে করা চুক্তির আওতায় এ অর্থ জমা করা হতো। পরে ওই অর্থ চীনা রপ্তানিকারক ও ইরানে অবকাঠামো নির্মাণকারী কোম্পানিগুলোকে পরিশোধ করা হতো।
নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর কৌশল
ইরানের সঙ্গে লেনদেনের অভিযোগে ঝুহাই ঝেনরংয়ের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। রয়টার্সের হাতে আসা একটি নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২২ জুলাই ইরানের জাতীয় তেল কোম্পানি চীনা প্রতিষ্ঠানটির কাছে বকেয়া অর্থের পরিমাণ নিশ্চিত করতে চিঠি দিয়েছিল। তবে রয়টার্স নথিটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
গোপন বাণিজ্যব্যবস্থায় নিজেদের ভূমিকা ও ওই নথি সম্পর্কে জানতে ইরানের জাতীয় তেল কোম্পানি, ঝুহাই ঝেনরং, ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রশ্ন পাঠানো হলেও তারা জবাব দেয়নি।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রয়টার্সকে জানিয়েছে, তারা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত নয়। একই সঙ্গে চীন বলেছে, আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি নেই এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ অনুমোদন দেয়নি—এমন একতরফা নিষেধাজ্ঞার তারা বরাবরই বিরোধিতা করে।
ইরানের জাতিসংঘ মিশনের কাছেও বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল। তবে তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের চাপ
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর চাপের মধ্যে চীন-ইরান বাণিজ্যের এই বিকল্প কাঠামো আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
গত আগস্টে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সতর্ক করে বলেন, যেসব দেশ ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করছে, তাদের সেই স